অতিথি

Featured

সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরের অন্ধকার দূর করল মেয়েটি। ছোট্ট একটা ঘরে একাই থাকে সে – একার সংসার। দিনের বেলায় যেদিন যেরকম কাজ জোটে, সেরকমই কাজ করে দিন চালিয়ে নেয় সে। আর সন্ধ্যের পর রান্না চড়ায়। আজও সেই কাজেই যাবে যখন, হঠাৎ-ই দরজায় টোকা।

“কে?”

“আমি পথিক।”

বেশ বড়ো করে ঘোমটা টেনে দরজাটা একটু ফাঁকা করল মেয়েটি। বাইরে একজন শহুরে বাবু দাঁড়িয়ে আছেন।

“আমি কলকাতা থেকে এসেছি। ট্রেন লেট ছিল সাড়ে তিন ঘণ্টা। বাড়ি আমার শীতলপুর গ্রামে। আজ ওপথে এগোনোটা কঠিন। আপনার বাড়িতে রাতটুকু শুধু ঠাঁই দিলে বড় উপকার হতো।”

মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল,”আসুন”।

প্রদীপের আলোতে খুব একটা ভালো করে দেখতে পেল না পথিক। আস্তে আস্তে চোখ সয়ে যেতে লাগল তার। খাটের এক পাশে বসল সে। খাট ছাড়া বসবার আর কোনো জায়গা নেই। এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল মেয়েটি। এবার পথিক তার মুখ দেখতে পেল।

“আর কিছু নেই আমার কাছে।”

“এই যথেষ্ট। বড় তেষ্টা পেয়েছিল।”

“রাতে আপনার পাতে ঘি দিতে পারব না। সামান্য কিছু তরি-তরকারি আছে শুধু। আজ রাতটুকু চালিয়ে নিতে পারবেন কি?”

“ভগবানের অসীম কৃপা যে আমায় আপনার খোঁজ দিয়ে দিয়েছেন। নইলে যে উপোস রাখতে হতো আজ। এই পাঁড়াগাঁয়ে শুনলাম কাছাকাছির মধ্যে হোটেল নেই কোনো। আমার তো আপনার প্রসাদে চলে যাবে। তবে আমি এসে আপনার বড় ক্ষতি করে দিলাম বলুন?”

“দরিদ্র আমি। তবু জানি অতিথি নারায়ণ। ভগবানকে যে এই অভাগী দু’টো রেঁধে খাওয়াতে পারবে, তাই যে সৌভাগ্য!”

“ছিঃ! ছিঃ! ভগবানের সাথে তুলনা করে এই নরাধমকে ছোট করবেন না! আর কাউকে দেখছি না যে?”

“আমার আর কেউ নেই। একাই থাকি, একাই দু’টো ফুটিয়ে খাই। দিব্যি চলে যায় দিন।”

“ভয় করে না আপনার একা থাকতে?”

(কয়েক মুহূর্ত চুপ)”সময় যায়। রান্না চড়াতে হবে। আপনি বিশ্রাম নিন বরং।”

“কী নামে ডাকব আপনাকে?”

“এ গ্রামের সবাই বিধবাবৌ বলে ডাকে আমায়।”

“সে তো গ্রামের লোক। আমি তো পথিক। একদিনের অতিথি আপনার। আমার আপনাকে ঐ নামে ডাকতে ভালো লাগবে না।”

“চঞ্চলা।”

পথিক গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ঘুম এসেও যেন আসছে না। কানে আসছে রান্নাঘর থেকে বাসনপত্রের ঠুং-ঠাং শব্দ। পথিকের মনে হলো মাথার ভেতরটা কেউ যেন ঘেঁটে দিলো।

“শুনছেন? ঘুমিয়ে পড়লেন কি?”

“হুঁ?”

“রান্না হয়ে গেছে। খেয়ে নেবেন চলুন।”

“দাঁড়ান। হাতমুখ ধুয়ে আসছি।”

পরম যত্নে থালায় ভাত সাজিয়ে দিল মেয়েটি। আড়ম্বর নেই, তবে আবেগ আছে। অনেকদিন পর কারোর জন্যে থালা সাজিয়ে অপেক্ষায় আছে সে। পথিক এসে খাবার মুখে দিয়েই বলল,”আরে! করেছেন কী বলুন তো! আমাকে সুস্বাদু খাদ্যের লোভ ত্যাগ করতে বলে রাজ অন্ন এনে দিলেন?! এ কেমন বিচার আপনার?”

“আমার পেটে অত বিদ্যে নেই। তাই বুঝি না। এ তিরস্কার না পুরস্কার?”

“এ এই অভাগার কৃতজ্ঞতা। স্বীকার করবেন তো?”

“পথিক, দোহাই আপনার। আর কথা বাড়াবেন না। যদি খুব অখাদ্যও রেঁধে থাকি, তবুও দয়া করে মুখে তুলুন। আমার আত্মার শান্তি হোক।”

“এ কি অনুরোধের পেছনে লুকিয়ে আদেশ?”

“আমি আর কিচ্ছুটি জানি না। আপনার খাওয়া না হওয়া অবধি আমি আর কথা বলব না।”

পথিক হাসল। খাওয়ার সময় আর কোন কথা হল না দু’জনের। খাওয়া শেষে চঞ্চলা পথিকের শয্যা তৈরি করতে লাগল।

“চঞ্চলা!”

“আজ্ঞা করুন।”

“একটি মাত্র বিছানা আপনার ঘরে। এখানে আমার জায়গা হলে গৃহীর কী উপায়?”

“গৃহ যখন গৃহীর, তখন উপায় সে বের করেই নেবে পথিক। কিন্তু অতিথির সেবায় ছাড় দিলে যে গৃহীর আত্মতৃপ্তি হবে না।”

“আর এরূপ আচরণে অতিথির যদি নিজেকে দোষী মনে হয়?”

“গৃহীর অনুরোধ সে যেন নিজেকে এবং গৃহীকে উভয়কেই ক্ষমা করে দেয়। শয্যা তৈরি। শুয়ে পড়ুন। রাত অনেক হয়েছে।”

চঞ্চলা রান্নাঘরে শুতে গেল। রান্নাঘরের খিল আটকে দিল সে। মাথার নিচে হাত রেখে মাটিকে আলিঙ্গন করে শুয়ে পড়ল। নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। পাছে তার কান্নার শব্দে পথিকের ঘুম ভেঙ্গে যায়। জীবনে তার পুরুষ আসে- খণ্ড চরিত্রের মতন। সময় দেয় না বেশিক্ষণ। কোন পুরুষই তাকে আঁকড়ে ধরে না কেন? কেন সবাই একা ফেলে পালিয়ে যায়? তারও তো ইচ্ছে করে পুরুষ আঁকড়ে বাঁচতে!

ভোররাতে বাইরের দরজা খোলার শব্দ পেল চঞ্চলা। তাহলে কি পথিক চলে যাচ্ছে? ধড়মড় করে উঠে পাশের ঘরে গেল সে। পথিক শয্যা ছেড়েছে। খোলা দরজা দিয়ে চঞ্চলা দেখল পথিক চলে যাচ্ছে। এক ছুটে সে দৌড়ে গিয়ে পথিকের হাত চেপে ধরল।

“সেদিনের মত আবার পালিয়ে যাচ্ছো জয়ন্তদা?”

“নয়ন, আমি আর পারছি না অভিনয় করতে। আমায় ছুটি দে তুই।”

“বেশ, দেবো ছুটি। তবে আমায় তুমি বলে যাও কেন চলে গেছিলে সেদিন? কতবার করে বললাম বাড়িতে বিয়ে ঠিক করেছে আমার, চলো পালিয়ে যাই। কেন শুনলে না আমায়?”

“তোর ভালো জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমার তো পড়াই শেষ হয়নি তখনও। কোথায় যাব পালিয়ে! খেতে দেবো কী তোকে! আমি তোকে ভালো থাকতে দেখতে চেয়েছিলাম। বড় ঘরে বিয়ে হলে তুই ভালো থাকতিস।”

“কত ভালো আছি সে তো তুমি দেখতেই পেলে বলো? বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যে তিনি চলে গেলেন। শ্বশুড়বাড়ির লোক আমায় অপয়া বলে তাড়িয়ে দিল। বাপের বাড়ি থেকেও নিল না আমায়। তোমার সাথে গেলে কি আরও খারাপ থাকতাম? না কি তুমি নিজে খারাপ থাকার ভয়ে আমায় নিলে না?”

(চুপ)

“ভালবাসতে না আমায় বলো কোনদিন? সেই লুকিয়ে লুকিয়ে পুকুরঘাটে আসা শুধু তোমার পড়ার ফাঁকের বিনোদন ছিল বলো? ব্যবহার করেছ আমায় তুমি?”

“ক্ষমা করিস আমায় নয়ন। আমি যে এতটা খারাপ, তা আগে জানলে তোর কাছে কোনদিন আসতাম না। তুই যে বড় পবিত্র!”

“আমার পবিত্রতা ঘুচাও তুমি জয়ন্তদা! রাধার মত কলঙ্কিনী করো আমায়। তাতেও যে সুখ!”

“আলো ফুটতে শুরু করেছে নয়ন। আমায় যেতে হবে।”

“তোমরা পুরুষ এমন কেন? পালিয়ে যাও সবসময়! ভালবাসার কাঙাল আমি। একটু ভালবাসতে কি সত্যিই পারো না?”  

“ভুল করেছিস তুই নয়ন আমায় ভালবেসে। আমি প্রতারক। প্রতারক কখনো কাউকে ভালবাসে না। আমি চললাম। ভাল থাকিস।”

“প্রতারক, তোমার প্রতারণাও যে আমি ভালবাসি। তবু তুমি ফিরে এসো, ফিরে এসো।”

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে মাটিতে বসে পড়ল নয়নতারা। নয়নের কপোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগল। তার মনে পড়ে গেল বিয়ের আগে জয়ন্তর সাথে শেষ দেখার কথা। জয়ন্ত তাকে বলেছিল আর কোনদিন যদি তাদের দেখা হয়, তবে যেন নয়ন তাকে এড়িয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে সেকথা পালন করে আসলেও আর পারল না নয়ন। ধৈর্যের বাঁধ গেল ভেঙে। তাই এই সমাজের বিপক্ষে গিয়ে ছুটে চলে আসা।

দ্রুত পায়ে চলতে চলতে নয়নের আর্দ্র প্রলাপ শুনতে পেল জয়ন্ত। তার মন চাইল গণ্ডূষ ভরে সে সেই জল পান করে। নয়নকে জড়িয়ে ধরে বলে,”ধুর পাগলি! তোর জয়ন্তদা আজও শুধু তোকেই ভালবাসে।”কিন্তু পারল না। কলকাতায় যে তার সাজানো সংসার রয়েছে। অতীতে ফিরে তাকালে চলবে না। তাই সময়ের কুটিল হাসির সামনে নিরুপায় হয়ে মাথা নত করে রইল সে।

স্ট্রিট লাইট

Featured

শেষ পর্ব

সারাদিন সময় যেন কিছুতেই কাটতে চায় না বিনয়বাবুর। আজ আর ছেলেমেয়ে দু’টো আসবে না। তিনি সময় কাটানোর উপায় খুঁজতে লাগলেন। হরিকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল বই পড়ার কথা। কথাটা মনে ধরল বিনয়বাবুর। ঠিক করলেন আজই যাবেন বই কিনতে। আর ঠিক করলেন এরপর থেকে রোজ বিকেলে হাঁটতেও যাবেন তিনি।

বই পড়ে আর ছেলেমেয়ে দু’টোকে দোতলার জানলা দিয়ে দেখেই দিন পার করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু একদিন তার খুব ইচ্ছে হল ওদের কাছ থেকে দেখতে। তাই ওরা আসার একটু আগে গলির মাথায় গিয়ে দাঁড়ালেন বিনয়বাবু। আর মেয়েটা আসতেই ওর সাথে সাথে কিন্তু রাস্তার অপর পাশ থেকে হেঁটে যেতে লাগলেন খুব সাবধানে। তারপর দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে লাগলেন ওদের। নাহ! এভাবে তাকিয়ে থাকাটা ভালো দেখায় না। তাই আবার রাস্তা পার হয়ে কিছুটা উল্টো দিকে হেঁটে আবার ওদের দিকে ফিরে আসতে লাগলেন তিনি। ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুনলেন মেয়েটা বলছে,”বাড়িতে বোধহয় সন্দেহ করছে। জানি না কিছু বুঝে গেছে কি না। জিজ্ঞেস করছিল বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন।”

“এভাবে বোলো না প্লিজ। সামলাও বাড়িতে। তোমার সাথে দেখা না করে থাকব কী করে!?”

“জানি না কী করব।”

বিনয়বাবু ওদের খুব কাছেই একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ওদের দেখতে লাগলেন-সাথে চলল চায়ের কাপে চুমুক। মেয়েটার চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। সে যেতে গেলেই ছেলেটা তার হাতটা একবার ধরল। মেয়েটা আবার একটুক্ষণ দাঁড়াল। তারপর চলে গেল। বিনয়বাবু একটু হাসলেন। তারপর রোজকার বিকেলের হাঁটা সেরে ঘরে ফিরলেন।

বইগুলো বিনয়বাবুকে যেন নতুন প্রাণ দিয়েছে। তিনি আর আগের মতো একাকীত্ব অনুভব করেন না। কাছেই এক লাইব্রেরির খোঁজ পেয়েছেন তিনি। লাইব্রেরি আর কিশোরবেলার প্রেম; এই নিয়ে ভালোই আছেন তিনি। তিনি হরিকে একটা টেপ রেকর্ডার কিনে দিয়েছেন। অবসর পেলে তাতে গান শোনে হরি।

এমনি এক সাধারণ বিকেলে বিনয়বাবু অপেক্ষা করছিলেন সেই কিশোর-কিশোরীর জন্যে। ছেলেটা এসে যথাসময়ে স্ট্রিট লাইটের নিচে দাঁড়াল। একটু পর মেয়েটাও এলো। কিন্তু কে যেন মেয়েটার পিছু নিয়েছিল। আর মেয়েটা ছেলেটার কাছে আসতেই সেও কাছে এসে খুব রাগী ভঙ্গিতে ছেলেটার সাথে কথা বলতে লাগল। বিনয়বাবু বুঝলেন কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। হয়ত আগন্তুক মেয়েটার বাড়ির লোক। এরপর তিনি দেখলেন আগন্তুক মেয়েটাকে সপাটে একটা চড় মেরে মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। ছেলেটা অসহায় মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় নিচের চায়ের দোকান থেকে অঞ্জন দত্তের গান ভেসে এল; রঞ্জনা আমি আর আসব না। ছেলেটা চলে গেল। আর তাদের কিশোরবেলার প্রেমের সাক্ষী হয়ে রইল বিনয়বাবু আর এই স্ট্রিট লাইট।
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                            

স্ট্রিট লাইট

Featured

পর্ব- ২

বাইরে বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল বিনয়বাবুর। বৃষ্টির শব্দে যেন হারিয়ে গেলেন অতীতে।

“শোনো না, বৃষ্টি হচ্ছে। দেখবে?”

“হ্যাঁ? বৃষ্টি দেখব? দাঁড়াও আসছি।”

(বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’জন)

“তোমার বুঝি বৃষ্টি খুব ভালো লাগে?”

“হ্যাঁ। বৃষ্টি ভালোবাসি আমি। বৃষ্টি দেখলে কেন জানি আমার সব দুঃখ চলে যায়।”

“কী দুঃখ তোমার? আমায় বলবে?”

(অবাক হয়ে)”সত্যি শুনবে তুমি?”

“সত্যি শুনব।”

“তোমার দুঃখ বেড়ে যাবে না?”

“না অভয়া। তোমার মন থেকে দুঃখের বোঝা না নামাতে পারাটাই আমার দুঃখ।”

“কেন? এই অচেনা অজানা মেয়েটার কষ্টে তোমার কী এসে যায়?”

“জানি না। তবে এই অপরিচিতার অপরিচিত কষ্ট আমায় কষ্ট দেয়।”

বাকি কথাগুলো যেন চোখে হয়ে গেল। বুঝে নিল অভয়া – যা বোঝার।

অভয়ার শিরায় শিরায় শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। তারা ছড়িয়ে যেতে যেতে বলল,”আমরা উন্মাদ! আমাদের সামলে নিতে পারবে না!” বিনয়বাবু বললেন,”তোমার কি শীত করছে?” অভয়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল খুব আস্তে। ফিসফিসিয়ে বললেন বিনয়বাবু,”কাছে এসো অভয়া।”অভয়াকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখল সে।

কিছুক্ষণ পর বিনয়বাবুর খেয়াল হল যে অভয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বিনয়বাবু তার মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,”কাঁদছ কেন তুমি?”

“আমি কখনো ভাবিনি কেউ আমার এমন করে খেয়াল রাখবে, আমার কথা শুনবে, আমাকে নিয়ে ভাববে।”

(একটু হেসে)”তবে বৃষ্টি দেখ। বৃষ্টি দেখলে আর কান্না পাবে না।”

“একটা কথা দেবে আমায়?”

“চেষ্টা করব। বলো।”

“আমার পাশে এভাবে থাকবে তো সারাজীবন?”

“এ কথা আমি দেব না তোমায়। এই ভাবনাটা সময়ের উপরেই ছেড়ে দিই না চলো?”

বলে বিনয়বাবু অভয়া দেবীর মুখটা আলতো করে তোলেন। অশ্রু মুছে দেন দু’হাত দিয়ে। গাল দু’টো দু’হাতে ধরে অল্প উঁচু করে অভয়ার ঠোঁটের কোমলতার স্বাদ নিলেন তিনি। প্রগাঢ় সে চুম্বন। ভালবাসার উষ্ণ আঁচে কেঁপে কেঁপে ওঠে অভয়া। সেই প্রথম মিলনের দিনটা কোনদিনও ভুলবেন না বিনয়বাবু।

কিন্তু মা হওয়া হল না অভয়া দেবীর। বিয়ের তিন বছরের মাথায় এই অপারগতার কথা যখন নিশ্চিতভাবে জানতে পারলেন তারা, তখন থেকেই অভয়া কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। সেই থেকে তেমনই চলতে লাগল। তাই নিজের ছেলেমেয়ের বয়সি কাউকে দেখলে খুব মায়া হয় বিনয়বাবুর।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বিনয়বাবু খেয়াল করলেন কখন যেন ছেলেটা আবার আজ স্ট্রিট লাইটের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু মেয়েটা এল না। ছেলেটা আকাশের মত বিষণ্ণ মনে ফিরে গেল। ছেলেটা চলে যেতেই কী যেন একটা অপ্রাপ্তিতে বিনয়বাবুকেও পেয়ে বসে। অপ্রাপ্তি কি সংক্রমিত হয়? কী জানি!

স্ট্রিট লাইট

Featured

পর্ব- ১

এই এতক্ষণ পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারলেন বিনয়বাবু। পুরনো বাসা ছেড়ে নতুন একটা বাসা ভাড়া করেছেন তিনি। বাসাটা খুবই ছোট। তবে একলা মানুষের পক্ষে যথেষ্ট। চারতলা বাড়ির দোতলায় থাকেন তিনি। স্ত্রী বিয়োগের পর একাকীত্বই যেন আগলে রাখছে তাকে।আগের বাসায় সর্বত্র অভয়ার স্মৃতি ছড়িয়ে। খেতে-ঘুমোতে উঠতে-বসতে শুধু অভয়ার অভিনীত চলচ্চিত্র দেখতে পান তিনি ঘরের আনাচে কানাচে। তাই ঐ বাসায় একা থাকা রীতিমতো মানসিক চাপের হয়ে যাচ্ছিল দিন দিন। বিনয়বাবুর সন্তানাদি নেই। তিনি একজন প্রৌঢ়। অভয়া দেবী চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই একাকিত্ব বোধ করেন যে বাকি জীবনটা কী নিয়ে কাটাবেন তাই তার সারাদিনের একমাত্র চিন্তা। এমন সময় অত বড় বাসায় থাকাটা শ্বাসরুদ্ধকর। তাই তার বাসা পাল্টানোর এই প্রয়োজনের উপস্থিতি।

ওহ হ্যাঁ! বিনয়বাবুর সাথে আরও একজন থাকে। নাম তার হরি। বিনয়বাবুর যাবতীয় দেখাশুনো এখন এই ব্যক্তিই করে। হরি প্রায় আট বছর ধরে বিনয়বাবুর কাছে থাকে। বাসা পাল্টানোর প্রস্তাব সেই প্রথম বিনয়বাবুকে দেয়। অভয়া মারা যাবার পর থেকে তার না কি ও বাড়িতে থাকতে ভয় করে। অগত্যা বিনয়বাবুকে হরির কথা রাখতে হল। কারণ বিনয়বাবুর এ পৃথিবীতে হরি ছাড়া আর কেউ নেই। আর হরিকে তিনি নিজের ভাইয়ের মতোই স্নেহ করেন।

ঘরে আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছুই নেই। ঐ সামান্য আসবাব গুছিয়ে দুপুরে খেয়ে একটু গড়িয়ে নিতে গেলেন বিনয়বাবু। ঘুম থেকে উঠে দেখেন হরি পাশে বসে আছে।

“বাবু চা খাবেন?”

“হ্যাঁ রে। দে।”

হরি চা বানিয়ে নিয়ে এলো। সাথে দু’টো বিস্কিট। হরির সাথে গল্প করতে করতে বিকেল গড়িয়ে গেল। দক্ষিণমুখী জানলা দিয়ে গলির বাইরের রাস্তাটা দেখছিলেন বিনয়বাবু। কত গাড়ি, কত মানুষ, কত রং, কত ছবি। একেকজনের জীবন এক এক রকম; আলাদা আলাদা গল্প। এক আইসক্রিমওয়ালা চলে গেল তার আইসক্রিমের ভ্যান নিয়ে। বিনয়বাবুর ছোটবেলার কথা মনে পড়তে লাগল।

“দাদা, একটা আইসক্রিম কিনে দিবি রে? দে না রে।”

“টাকা কোথায় পাব রে? আইসক্রিমের টাকা তো নেই সাথে।”

“বাবা যে টাকা দিল?”

“ওতো চিনি কিনতে দিয়েছেন।”

“দে না দাদা।”

সেদিন কম চিনি কিনে বাড়ি ফিরেছিল কিশোর বিনয়। তারপর বাবার সে কী বকুনি! বোনকে বাঁচাতে মিথ্যে বলেছিল সে। বলেছিল, বাকি টাকা না কি হারিয়ে গেছিল; তাই কম চিনি কিনতে হয়েছে তাকে। তবে আইসক্রিমটা খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিল তার বোন। বোনের সেই মিষ্টি হাসিমাখা মুখটা আজও মনে পড়ে তার।

গলির স্ট্রিট লাইটটার নিচে একটা কিশোর ছেলে এসে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে। প্রথমটায় তিনি খেয়াল করেননি। এবার খেয়াল করলেন। রাস্তার ওপার থেকে এক কিশোরী তার খোলা চুল হাওয়ায় মেলে ছেলেটির দিকেই আসছে। মেয়েটা কাছে আসতেই দু’জনের মুখে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। শত ক্রোশ হাঁটার পর যেন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছে ওরা। পুরোটা সময় বিনয়বাবু ওদের দেখতে লাগলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ না। একটু পরেই মেয়েটা চলে গেল-আর ছেলেটাও। পরদিন ওরা এল না। বিনয়বাবু সারা বিকেল ওদের জন্যে অপেক্ষা করলেন। নাহ্‌! এল না। তার মনে হল আর বুঝি আসবে না ওরা। কেন জানি ওদের দেখে ভালো লেগে গেছে বিনয়বাবুর। মনে পড়ে যায় অভয়ার সাথে রঙিন দিনের কথা। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল বিনয়বাবু আর অভয়ার। প্রথমটায় কেউই কাউকে চিনত না। কিন্তু বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়ার পর একে অপরকে নিয়ে ভাবতো। অফিসের কাজের ফাঁকে মনে পড়তো অভয়ার কথা। অভয়া একটা নিয়ম করে দিয়েছিল। প্রতি সপ্তাহে একে অপরের প্রতি যত অভিযোগ, খারাপ লাগা, ভাল লাগা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর চাহিদা যা আছে তা একটা কাগজে চিঠির মত লিখে টেবিলে রেখে যেতে হবে। দিনটা ছিল বুধবার। একদিনও মিস্‌ হলে চলবে না। এতে না কি একে অন্যকে চেনাটা সহজ হবে। ভাবতে ভাবতে বিনয়বাবুর ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা ফুটে ওঠে। আর মনে মনে বলেন,”অভয়া, আমায় বুঝি তোমার চেনা হয়ে গেছে? তাই চলে গেলে একলা রেখে?”

হঠাৎ

শেষপর্ব

ছাই রঙা একটা শাড়ি পরে ঋত্বিকা সমুদ্রের ঢেউয়ের তালের সাথে একটা গান গাইছে। খেয়াল করেনি কে যে নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। গানের শেষ লাইনটা ছিল এমন,”ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটা লিখ তোমার মনের মন্দিরে।

“লিখেছি এতদিন আর লিখবও চিরকাল।”

(চমকে উঠে) “অয়ন!”

“তুমি একা যে? কবে এলে এখানে?”

“গতকাল। তুমি?”

“আমিও। কাল রাতে চলে যাব।”

“আমি ঘুরতে এসেছি। ব্যস্ত জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।”

“কেমন আছ তুমি?”

“ভালোই আছি। তুমি?”

“ভালো। দাদা কেমন আছেন?”

“দাদা?”

“তোমার বর।”

“নেই। আমি তো বিয়ে করিনি।”

“মানে? কেন? করবে না?”

“না। তোমার খবর বল।”

“আরে সেসব পরে হবে। আগে বল তুমি বিয়ে করলে না কেন?”

“সময় নিতে বলেছিলে আমায়। সময় নিয়ে বুঝলাম যে যেহেতু আলাপ আমার প্রথম প্রেম তাই ওকে আমার মনে পড়ে। আর পড়বেও সারাজীবন। কিন্তু ভালো আমি তোমায় বেসেছি। আর ফিরতি ভালবাসা নিতে হলে আমি তোমার কাছ থেকে নেব নইলে না।”

“তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছ?”

“না, না। ঠিক অপেক্ষা না। কোনো expectation নেই আমার। আমি শুধু আমার মতো করে ভালবেসে গেছি এই এক বছর; আর এখনো বাসি। আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে?”

“বলো।”

“যে কারণটা দেখিয়ে বিয়েটা ভেঙেছিলে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যে ছিল,তাই না?”

“আর কী করতাম বলো? বিয়েটা ভাঙতে হতো। কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অগত্যা একটা মিথ্যে মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করালাম এক বন্ধুকে দিয়ে যে আমি বাবা হতে পারব না। ব্যস, কাজ হয়ে গেল। আমি আমার বাবা মাকেও মিথ্যে বলে রাখলাম যাতে অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে না বলে।”

“অয়ন! তুমি আমাকে আজও এতো ভালবাসো?”

“আমি নিজেকে ভালবাসি ঋত্বিকা। আর নিজেকে ভালো রাখার জন্যে আমার তোমাকে ভালবাসা প্রয়োজন। Basic need-এর মতো।”

ঋত্বিকা হাসল। তার চোখের কোণে জল সমুদ্রের মিঠে রোদে ঝলমল করছে। পাশের আগাছা থেকে একটা ফুল তুলে নিল ঋত্বিকা। আর হাঁটু গেড়ে বসে বলল,”will you marry me?”

অয়ন মুখে কিছু বলল না। শুধু ঋত্বিকাকে উঠিয়ে বসাল তার পাশে। আর প্রচণ্ড উত্তেজনায় বলল,”আজ আমার পাগলামি করতে খুব ইচ্ছে করছে। করবে?”

“হ্যাঁ, বলো।”

“চলো পালিয়ে বিয়ে করি।”

“তার আগে একটা কবিতা বলবে দু’জনে?”

“ঠিক আছে।”

“চলো না শেষের কবিতার কিছু লাইন বলি?”

“কেন? হঠাৎ লাবণ্য হয়ে ওঠার ইচ্ছে?”

“জানি না। তবে খুব ইচ্ছে করছে।”

“আমি কিন্তু অমিত নই – শোভনলাল।”

সমুদ্রের হাওয়ার সুর আর গর্জন তাদের কবিতায় এক নতুন মাত্রা দিল। শুরু করল অয়নই।

“এই দেখুন-না, আজ সকালে বসে হঠাৎ খেয়াল গেল, আমার জানা সাহিত্যের ভিতর থেকে এমন একটা লাইন বের করি যেটা মনে হবে এইমাত্র স্বয়ং আমি লিখলুম, আর কোনো কবির লেখবার সাধ্যই ছিল না।”

“বের করতে পেরেছেন?”

“হ্যাঁ,পেরেছি।”

“লাইনটা কী বলুন-না।”

“For God’s sake, hold your tongue

            and let me love!

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর।

ভালোবাসিবারে দে আমারে আমারে অবসর।”

“সুখবর আছে। মাসিমার মত পেয়েছি। যদি আপত্তি না কর তোমার নামটা একটু ছেঁটে দেব।

তোমাকে ডাকব বন্য বলে।”

“বন্য!”

“না না, এ নামটাতে হয়তো-বা তোমার বদনাম হল। ওরকম নাম আমাকেই সাজে। তোমাকে ডাকব- বন্যা। কী বল?”

“তাই ডেকো, কিন্তু তোমার মাসিমার কাছে নয়।”

“কিছুতেই নয়। এ-সব নাম বীজমন্ত্রের মতো, কারো কাছে ফাঁস করতে নেই। এ রইল আমার মুখে আর তোমার কানে।”

“আচ্ছা বেশ।”

“আমারও ঐরকম একটা বেসরকারি নাম চাই তো। ভাবছি ‘ব্রহ্মপুত্র’ হলে কেমন হয়। হঠাৎ বন্যা এল তারই কূল ভাসিয়ে দিয়ে।”

“নামটা সর্বদা ডাকার পক্ষে ওজনে ভারী।”

“ঠিক বলেছ। কুলি ডাকতে হবে ডাকবার জন্যে। তুমিই তাহলে নামটা দাও। সেটা হবে তোমারই সৃষ্টি।”

“আচ্ছা, আমিও দেব তোমার নাম ছেঁটে। তোমাকে বলব মিতা।”

“চমৎকার! পদাবলীতে ওরই একটা দোসর আছে- বঁধু। বন্যা, মনে ভাবছি, ঐ নামে না হয় আমাকে সবার সামনেই ডাকলে, তাতে দোষ কী।”

“ভয় হয়, এক কানের ধন পাঁচ কানে পাছে সস্তা হয়ে যায়।”

“সে কথা মিছে নয়। দুইয়ের কানে যেটা এক, পাঁচের কানে সেটা ভগ্নাংশ। বন্যা!”

“কী মিতা।”

“তোমার নামে যদি কবিতা লিখি তো কোন মিলটা লাগাব জানো?-অনন্যা।”

“তাতে কী বোঝাবে?”

“বোঝাবে তুমি যা তুমি তাই-ই, তুমি আর কিছুই নও।”

“সেটা বিশেষ আশ্বর্যের কথা নয়।”

“বল কী, খুবই আশ্বর্যের কথা। দৈবাৎ এক-একজন মানুষকে দেখতে পাওয়া যায় যাকে দেখেই চমকে বলে উঠে, এ মানুষটি একেবারে নিজের মতো, পাঁচজনের মতো নয়। সেই কথাটি আমি কবিতায় বলব-

            হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,

            আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।”

“তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-

  গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

            হে বন্ধু, বিদায়।”

গোধূলির শুভলগ্নকে সাক্ষী রেখে পথ চলতে শুরু করল অয়ন ও ঋত্বিকা; আবার নতুন করে।

হঠাৎ

পর্ব- ৩

“সবই তো শুনলে।“

“হুম।“

“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।“

“তুমি কী চাও সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।“

“সেটা আমি বুঝতে পারছি কিন্তু খুঁজে তো বের করতে পারছি না।“

“এরকম বললে চলবে না ঋত্বিকা। ভাবো, আরো ভাবো। দাঁড়াও আয়নার সামনে। জিজ্ঞেস করো নিজেকে। প্রশ্নবিদ্ধ করে ঝাঁঝরা করো নিজেকে। উত্তর খুঁজে বের করো । আমাদের বিয়ের আর বেশিদিন বাকি নেই ঋত্বিকা!”

এমন সময় কেঁদে ফেলে ঋত্বিকা। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে সে। একটুক্ষণ পর ঋত্বিকার হাতে একটা কয়েন দেয় অয়ন। আর বলে,”টস করো, যার নাম পরবে তার কাছে ফিরে যাবে।“ঋত্বিকা অবাক হয়ে বলে, ”ছেলেমানুষি এটা! পারব না আমি!”

“At least এটা তো খুঁজে বের করা উচিৎ যে মন থেকে তুমি কাকে চাও!”

“আমি তোমাকে চাই।“

“কিছু মনে করো না please. এ বিষয়ে আমার doubt হচ্ছে।“

“কেন? তোমাকে না চাইলে সে কথা তোমায় বলে দিতাম। এমনকি আলাপকে চাই এ কথাও তোমায় বলে দিতাম।“

“আমি জানি। তাহলে আমায় একটা কথা বলো। তুমি আলাপকে চাও না – আমাকে চাও। তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?”

“জানি না। কিচ্ছু জানি না আমি।“

এক অস্বস্তিকর নীরবতা। কারোরই কাউকে কিছু বলার নেই। নীরবতা ভাঙল অয়ন।

“দেখ ঋত্বিকা, আমি তোমাকে ভালবাসতে পেরেছি কি না জানি না। তবে চেয়েছিলাম; এখনো চাই। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি to be honest আমার মনে সন্দেহ জাগিয়ে দিয়েছে। এরকম অবস্থায় তোমার সাথে নতুন জীবন শুরু করাটা কতটা ঠিক সে প্রশ্ন এসে হাজির হয়েছে। আমার মনে হয় না আমাদের এখন বিয়েটা করা উচিত। তোমার আরো সময়ের প্রয়োজন।“

“তুমি কি বলছ এগুলো! “

“আমরা সবাই স্বার্থপর। আমার নিজের আর তোমার স্বার্থের কথা ভেবেই বলছি। এখন সময় নেওয়ার সময়। সময় না নিলে ভুল হয়ে যাবে – বড় ভুল হয়ে যাবে।“

“তোমাকে আমি ভরসা করি অয়ন। তুমি ভেবে বলছো তো?”

“হ্যাঁ, ঋত্বিকা। আমি ভেবেই বলছো।“

“ঠিক আছে। কিন্তু বাড়ি?”

“ওটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।“

সত্যিই ঋত্বিকার সময়ের প্রয়োজন ছিল। আর সেটা যে অয়ন বুঝতে পেরেছে তার জন্যে অয়নের কাছে বরাবরের মতো অশেষ কৃতজ্ঞ সে। কিন্তু বিয়েটা ভাঙ্গার জন্যে অয়ন যে কি করবে তা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে না। বিয়েটা শেষমেশ ভেঙ্গেই যায়। দুই পরিবার এমনকি অয়ন আর ঋত্বিকার মধ্যেও কোন যোগাযোগ থাকে না। ঋত্বিকা সুযোগ পায় আর একবার আলাপের কথা ভেবে দেখার।

হঠাৎ পর্ব- ২

আলাপ আর ঋত্বিকার এখন রোজ কথা হয়। সপ্তাহ খানেক হয়েছে ওদের কথা বলার শুরুর বয়স। এমনি চলতি পথে হঠাৎ ঋত্বিকা বলল যে সে একবার দেখা করতে চায় আলাপের সাথে। তাকে না কি কী একটা দেওয়ার আছে ঋত্বিকার। আলাপ মনের আকাশে খুশির ঘুড়ি উড়িয়ে দেয়।

একদিন সন্ধ্যেয় অফিস শেষে এক কফি শপে দেখা করে তারা। একথা-সেকথায় নানা কথার ট্রেন চলতে থাকে অবিরাম। আর আলাপ মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকে তার ঋত্বিকাকে। এই সাতটা দিনেই ঋত্বিকাকে যেন খুব আপন করে নিয়েছে সে – সেই আগের মতো। আজ খুব ইচ্ছে করছে ঋত্বিকার আঙুল্গুলোর অগ্রভাগের সাথে নিজের আঙুল ছোঁয়াতে। ধীরে ধীরে নিজের হাতটা এগোতে থাকে আলাপ। ঋত্বিকার হাতের খুব কাছাকাছি আসতেই ঋত্বিকা বলে ওঠে,”তোমাকে একটা জিনিস দেব বলছিলাম।“এই বলে সে তার ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে। কার্ডটা দিয়ে আলাপকে সে বলে,”আমার বিয়ে, আগামী মাসে। তুমি আসবে কিন্তু।“ ঘটনার আকস্মিকতায় আলাপ কী বলবে ভেবে পায় না। তাই সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,”আর কিছু বলার আছে তোমার?”

না, আমার কিছু বলার নেই। এটা দেওয়ার ছিল শুধু।

আমারও আর কিছু বলার নেই। উঠি তাহলে?

আসবে কি না বললে না?

দেখি।

ঠিক আছে। চলো।

এমনটা কেন করলো ঋত্বিকা? এটা কি তার অভিমান? না কি সত্যিই বন্ধু ভেবে দিল কার্ডটা? সেটা জানতে ফিরে যাওয়া যাক দু’দিন আগের এক বিকেলে। চায়ের কাপের ধোঁয়ার সাথে বৃষ্টির শব্দ মিশিয়ে প্রশ্ন করেছিল নিজেকে,”কী হচ্ছে এটা?”

কেন? যা হচ্ছে তোমার সম্মতিতেই তো হচ্ছে। (মন উত্তর দিল তাকে)

রোজ কথা বলা; কেন হচ্ছে এসব? কী চায় আলাপ এতদিন পর?

হয়ত তোমাকেই; আবার।

কিন্তু কেন? ও তো নিজের ইচ্ছেতেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছিল।

হ্যাঁ। কিন্তু আজ তোমার অভাব বোধ করছে। পূরণ করতে চাইছে সেটা।

এখন?

তুমি কি চাও? চাও কি ওকে? বিশ্বাস করতে পারো?

জানি না।

সম্পর্কটা তুমি চাও কি?

তাও জানি না।

এমন সময় কাপের চা শেষ হয়ে গেল। কাজে ফিরতে হবে আবার।

দু’দিন ধরে ভেবে সে ঠিক করল আলাপকে হারানোর পর যে মানুষটা তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছে, তাকে সে ঠকাতে পারবে না। অয়নকে ঠকালে সে কোনদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না – কোনদিন না। আর সে জানে – খুব ভালো করে জানে, আজ আলাপ তার সাথে থাকলেও দু’দিন পর আবার ঠিক তাকে একা ফেলে চলে যাবে। সুতরাং, আজ আলাপের স্মৃতি সে মনের কোণে সরিয়ে  রাখতে চায় যাতে ধুলো পড়ে যায়।