হঠাৎ

পর্ব- ১

অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল আলাপের আজ। রাস্তা পার হওয়ার জন্য জেব্রা ক্রসিংয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে সে। রাস্তা পার হতেই হঠাৎ হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল তার। “আরে!”যে ফোনটা তুলে দিল, তাকে এতদিন বাদে এত কাছ থেকে দেখে কিছুক্ষণ কথা ভুলে গেল সে। তারপর ক্রসিংয়ের সময় শেষ হয়ে যেতেই রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে আসতে হল দুজনকে।

-কেমন আছ?

-ভালো। তুমি?

-এইতো চলছে। কোথায় যাচ্ছিলে?

-বাড়ি ফিরছিলাম।

-জব  করছ?

-হুম। তোমার কি খবর?

-আমিও তাই। ফিরছিলাম অফিস থেকে। বাস ধরবে?

-হ্যাঁ।

-একটু তো time লাগবে আবার ক্রসিংয়ের জন্য। (একটু দম নিয়ে) Sorry, আমার ফোনটা পড়ে গিয়ে তোমার দেরি করিয়ে দিল।

-না,না, ঠিক আছে। তোমার ফোনটা ঠিক আছে তো?

-হ্যাঁ, একদম। শুধু  screenguardটা একটু ফেটে গেছে।

-ওহ্‌!

দু’বছর পর আলাপ আর ঋত্বিকার হঠাৎ দেখা। কোনদিন আবার দেখা হতে পারে-ভাবেনি কেউ। কিন্তু রোজ মনে করে গেছে একজন আর একজনকে। আজ এতদিন পর আলাপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঋত্বিকা। উত্তেজনায় ভেতরটা কাঁপছে তার। আলাপ চায় না এত তাড়াতাড়ি ঋত্বিকাকে যেতে দিতে। কিন্তু কী করে আটকাবে সে? আর ঋত্বিকা? ওর মনেই বা কী চলছে? শুনবে কী আলাপের কোন কথা?কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর আলাপ বলে উঠল,”কফি?”

-দেরি হয়ে যাবে। আজ থাক।

-চল না please। কতদিন পর দেখা আমাদের। এক কাপ কফি তো খাওয়াই যায় বল?

বরাবরের মত এবারও পারল না ঋত্বিকা আলাপের অনুরোধ ফেলতে। কোনদিন পারেনি আগে। সেও চাইছিল আজ এতদিন বাদে আলাপের সাথে দেখা যখন চলতে চলতে হয়েই গেল তো রাস্তার ধারে at least এক কাপ চা কি খাওয়া যায় না? সে না হয় খুব ঠান্ডা করে ফুঁ দিয়ে যতটা ধীরে পারা যায় ততোটা ধীরেই খাবে চা টা। না হয় আজ সাথে দু’টো বিস্কিটও নিয়ে নেবে সে। এরপর পাঁপড়ি চাটের কথা কী তোলা যায়? ভেবে দেখা যাবে না হয়। এমন সময় এক কাপ কফির অনুরোধ সামনে হাজির।

দু’কাপ কফির নির্দেশ দিয়ে কয়েক মুহূর্ত অস্বস্তিকর নীরবতা। তারপর কলেজের পুরোনো কথা, বাড়ির কথা, বন্ধুদের কথা, এভাবে কখন যে দু’বার করে কফি খেয়ে দু’ঘণ্টা পার করে দিয়েছে দু’জন খেয়ালই করেনি। এবার মনে হল ফিরতে হবে। বিল মিটিয়ে যাওয়ার পর রাস্তার ধারে ফুলের দোকান। আলাপের এখন যেন ফুল না কিনলেই নয়। ঋত্বিকার প্রিয় বেলী ফুল। আজ খোঁপা করেছে সে। বেলী ফুল দেখেই কিনে ফেলল আলাপ। আর সেটা ঋত্বিকাকে দিতেই সে আনমনে বলে ফেলল,”তুমিই পরিয়ে দাও!” বলেই হঠাৎ মনে হল তার, কাকে কী বলে ফেলল সে! কেন বলল?!

-আ-আচ্ছা ঠিক আছে। আমায় দাও। আমি পরে নিচ্ছি।

-না-না আমি পরিয়ে দিচ্ছি।

-না ঠিক আছে। জোর করো না please.

আলাপ ভয় পেয়ে গেল। পাছে ঋত্বিকা আবার কথা বলা না বন্ধ করে দেয়। এবার বাড়ি ফেরার পালা। দু’জন দু’দিকের বাস ধরে চলে গেল।

রাতে ঘুমোতে গিয়ে ঘুম আসলো না দু’জনের কারোরই। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিল আলাপ। যত রাতই হোক না কেন, ফোনটা সে করবেই ঋত্বিকাকে।

-হ্যালো।

-হ্যালো।

-আচ্ছা, আজ ফোনের পাশে আর কিছু পড়ে থাকতে দেখেছিলে?

-না তো। কেন আরও কিছু ছিল?

-হ্যাঁ। আমার হাতে একটা ৫ টাকার কয়েন ছিল-পড়ে গেছিল। দেখেছিলে?

-না তো, সেরকম তো কিছু দেখিনি।

-ঘুমোওনি তুমি এখনও?

-না, ঘুম আসছে না।

-জানো আমারও না ঘুম আসছে না।

বাকিটা না হয় ওরাই বুঝে নিক। তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। দূর থেকে ঋত্বিকাকে দেখে ওর কাছে গিয়ে ফোনটা ইচ্ছে করে ফেলেনি তো আলাপ?

ঊড়োজাহাজ

খুব কি বিরক্ত করছিলাম আমি? খুব?? এমনটা করতেই হল তোকে? এমন কী করেছিলাম যে আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিতে হবে?! একবারও কি এই ভাবনাটা আসেনি মনে যে মধু থাকবে কী করে তোকে ছাড়া ? সত্যিই আসেনি মনে ?

হ্যাঁ, আমি জানি, তুই আমাকে কখনো অমন চোখে দেখিসনি। তা মেনে তো নিয়েছি আমি। একবার ভুল করে জোর করে ফেলেছিলাম। কই আর তো করিনি অমন – বলিনি তো অমন করে কথা। তবে কেন ? কেন এমন হঠাৎ এমন করে বোবা সাজা তোর ?

ঠিকই তো ছিল সবকিছু। তার মধ্যে আমি একখানা কাণ্ড করে বসলাম । বেশ করেছি প্রপোজ করেছি! তাতে হয়েছেটা কী! তুই বললি হবে না এসব আমার সাথে। মেনে তো নিয়েছি। এসবের পরেও কথা বলতিস, একসাথে গান গাইতিস, একসাথে দু’টো কবিতা পড়তাম আমরা। তারপর হঠাৎ করে হলটা কী তোর ?! অন্যদিকে ফিরে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছিস কেন ?

এই কেন’র উত্তর কোনদিন মেলেনি। আর কথা বলেনি সৌগত মধুর সাথে। আর দেখাও হয়নি ওদের। তবু মধু ভাবে সৌগতের কথা। এতগুলো বছর পর আজও ভাবে তার জীবনের প্রথম প্রেমের কথা। ভালবাসা সত্যিই হঠাৎ করে হয়। যে মধুবন্তী ভেবেছিল কোনদিন কারো প্রেমে পড়বে না সেই মধুবন্তী এক কোঁকড়াচুলের মালিকের প্রেমে পড়ে গেল কোনো কারণ ছাড়াই। সবটা দিয়ে তাকে ভালবাসতে চাইল। কিন্তু পারল কি ? পারল না। সময় আর সুযোগ দু’জনেই মুচকি হেসে পেছন ঘুরে চলে গেল। মধুর সাথে রয়ে গেল কিছু স্মৃতি আর খানিকটা অবুঝ আবেগ। তাই সে রোজ সৌগতের জন্য কিছু না কিছু লেখে। আর লেখা হলে সেটাকে উড়োজাহাজ বানিয়ে উড়িয়ে দেয়। হাওয়ায় পাখনা মেলে ঊড়োজাহাজ ওড়ে; আর এক বুক শুন্যতা নিয়ে মধুবন্তী বলে,”সৌগত, তুই ভাল থাকিস।”